দীঘা থেকে বিচিত্রপুর ম্যানগ্রোভ অরণ্য ভ্রমণ কাহিনী – সুমিতা নন্দী দে
২৬ সে জানুয়ারি, ২০২৪ সালে গিয়েছিলাম হাওড়া স্টেশন থেকে দুপুরে ২:৪৫ এর কান্ডারী এক্সপ্রেস করে দীঘা। প্রায় সব বাঙালির চিরচেনা জায়গা দীঘা। তবে শুধু যে দীঘাতেই থাকি তা নয়, নতুন নতুন জায়গাতেও যাবার চেষ্টা করি।
শুক্রবার ২৬ সে জানুয়ারি, আমরা যাত্রা শুরু করলাম নিউটাউন থেকে। তাই যথারীতি একটা ক্যাব বুক করে নিলাম, আমরা বেরোলাম ঠিক ১১:৫৫ মিনিটে। (আর আমরা যখনই স্টেশনে যাই না কেন, সব সময়ই হাতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় নিয়ে আগে বেরোই।) আর সেইদিনই ধর্মতলা থেকে একটা যানজটে পরে যাই আর সেটা শেষ হয় হাওড়া ব্রিজ পর্যন্ত, আর সেখানেই আমাদের এই আগে থেকে বেরোনো টা কাজে লেগে যায়। পরে জানতে পারি ২৬ সে জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবসের জন্যই হয়তো কোনো রোড শো গেছে তাই এত বড় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা প্রায় ২:৩৫ মিনিটে হাওড়া স্টেশনে পৌছালাম, কোনো ক্রমে ট্রেনটা পেলাম। ট্রেন ছাড়ল ২:৫০ মিনিটে। বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বেরোনার কারণে ঠিক মত খাওয়া হয়নি তাই ট্রেনের মধ্যে চপ, ঝালমুড়ি খেলাম। আমরা পৌঁছালাম রাত্রি ৭ টায়।
আমাদের হোটেলে বুক ছিল তাই সরাসরি হোটেলে চলে গেলাম অটো করে। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে গেলাম ওল্ড দীঘা বিচে, সেখানে শীতকালীন হওয়া তাই গায়ে একটা সোয়েটার দিতেই হলো। তারপর সেখানে বসে ঘুগনি খেলাম, এরপর ভেলপুরি খেয়ে আপাতত পেটকে শান্ত করা গেলো, বেশ কিছুটা সময় কেটে গেলো সমুদ্রের পারে বসে। তারপর সী বিচ থেকে আসবার সময় রাস্তার পাশে একটা দোকান থেকে আমরা রুটি আর মটর পনির খেয়ে হোটেলে ফিরলাম।
শনিবার, ২৭ সে জানুয়ারী। এই দিন সকালে উঠে একে একে তৈরি হয়ে নিলাম, আজকে যাবো দীঘার একটি অন্যতম স্থান অমরাবতী পার্ক। তাই আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা থেকে একটা অটো ভাড়া করে চলে গেলাম সেই পার্কে। পার্কে প্রবেশ মূল্য আছে। এখানে ছোটো থেকে বড় সব বয়সের মানুষদের এই জায়গাটি ভালো লাগবে। অনেক ধরনের দোলনা আছে, আর সেগুলি পেয়ে আমার বাচ্চাদের তো খুব আনন্দ, আর পার্কটি বেশ বড় জায়গা নিয়ে তৈরি। এখানে রোপওয়ের ব্যবস্থা আছে, তবে এখন কাজ চলছে। এছাড়াও একটি বড় পুকুর আছে তাতে বোটিং করার যায়, আমরা একটা বোট ভাড়া করে চড়লাম, বোটে উঠতে প্রথমে বাচ্চারা ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু পরে মজা করেছিল, কয়েকটা রাজহাঁস জলে খেলা করছিল। পার্ক থেকে বেরোলাম দুপুর একটায়। ফিরে এলাম হোটেলে, তারপর সবাই একে একে স্নান করে হোটেলই লাঞ্চ করলাম। আবার বেরোলাম তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হেঁটেই গেলাম ওল্ড দীঘা মার্কেটে, বাড়ির সবার জন্য কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে। হোটেলে ফিরলাম রাতের খাবার খেয়ে।
রবিবার, ২৮ সে জানুয়ারি, এই দিন সকালবেলায় ঠিক করলাম বিচিত্রপুর যাবো। এর আগে দীঘায় দুবার এসেছি কিন্তু কোনোবারই যাওয়া হয়নি বিচিত্রপুরে, তাই সকালের খাবার খেয়ে আমরা একটা অটো করে চলে গেলাম বিচিত্রপুরের উদ্দেশ্যে, রাস্তায় পড়ল ওড়িশা রাজ্যের বালাসর জেলার চন্দনেশ্বর মন্দির। খুবই সুন্দর এই মন্দির, মন্দিরের গর্ভগৃহে বাবা চন্দনেশ্বর বিরাজ করছেন। এখানে বড় আটচালা আছে তাতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়েছে, কেউ পুজো দিচ্ছে, কেউ মাথার চুল দান করছে ইত্যাদি। মন্দিরের একপাশে একটা বড় পুকুর আছে, অনেকেই আবার সেই পুকুরের জল মাথায় ছিটিয়ে দিচ্ছে, আর একদিকে সারি দিয়ে নানাবিধ দোকানপাট বসেছে। এইসব দেখে মন্দির থেকে বেরোলাম ৯:৩০ মিনিটে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা ছিল তার জন্যে আমরা তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম। একেবারে টিকিট কাউন্টারে চলে গেলাম,কারণ ভাটা পড়ে গেলে আর বিচিত্রপুরের সেরা আকর্ষণ বোটিংটাই করে হবে না। ভাটা শুরু হয় ১২টায়, কিন্তু টিকিট কাউন্টারে টিকিট দেওয়া বন্ধ হয়ে যায় ১১টাতেই। আবার বিকেল ৩টের পর টিকিট কাউন্টার খুলে যায়। আমরা টিকিট কেটে চলে গেলাম বোটিংয়ের জায়গায়, সেখান থেকে বোটে করে সুবর্ণরেখা নদীর উপর দিয়ে চলে গেলাম মোহনায়, যেতে সময় লাগে ১০ মিনিট। বোটে যেতে যেতে অনেক খাদিয়াল পড়বে আর দুপাশ দিয়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। অতীব সুন্দর, যেন একটুকরো সুন্দরবন বলতেই হয়, যদিও সুন্দরবন যাওয়া হয়নি। আমাদেরকে নদীর একপাশে নাবিয়ে দিলো, মনে সেখান থেকে বিচিত্রপুর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট শুরু হয়েছে। এখানে প্রতিটি গাছেরই শ্বাসমূল ও ঠেসমূল, এছাড়াও চারি দিকে লাল ছোটো কাঁকড়ার গর্ত। এখানে কয়েকটা দড়ি দিয়ে ঝোলানো বাঁশের দোল্লা আছে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক বসবার। এখানে ঘোড়ার জন্য সময় মাত্র ৩০ মিনিট, এই সময়ের মধ্যে যতটুকু প্রকৃতির মাঝে বিচরণ করা যায় আর কি। যাই হোক আমরা সময় কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম, আসবার সময় আমরা উদয়পুর বীচে গেলাম। তবে সেখানে গিয়ে এবার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল কারণ সেখানকার মাছের দোকানগুলো সমুদ্রের জলের এত কাছে বসছে, আর সেখানেই বসে মাছ ধুচ্ছে, যার ফলে ঢেউয়ের জল গুলোর সথে মাছের আঁশ গুলো পায়ে লাগছে, আর একটা মাছের আঁশটে গন্ধ লাগছে। আমি যখন ২০২১ সালে অক্টোবরে উদয়পুর গিয়েছিলাম তখন গুটি কয়েক দোকান, তাও সেগুলো অনেকটা উপরে বসার কারণে এত গন্ধ ছিল না। যাই হোক এসব দেখে দুপুরে হোটেলে ফিরলাম।
তারপর আবার সন্ধ্যেবেলায় বেরোলাম, আবার কিছু কেনাকাটা করলাম, বাচ্চাদের জন্যে খেলনা কেনা হলো, একটা ব্যাগ, দুজোড়া শাঁখা, কয়েকটা কড়ির হ্যান্ডমেড কানের কিনলাম।
২৯ শে জানুয়ারি সোমবার, এইদিন ফেরার দিন। আমরা হোটেলে থেকেই স্নান ও সকালের খাবার খেয়ে নিলাম। আমাদের ট্রেন সকাল ১০:৩৫ এ, তাতে করে হাওড়া স্টেশন এলাম। তারপর যাত্রিসাথিতে নিউটাউন ফিরে এলাম।
দীঘা থেকে বিচিত্রপুর ম্যানগ্রোভ অরণ্য ভ্রমণ কাহিনী – সমাপ্ত
আপনাদের লেখা আমাদের ওয়েব সাইটে জমা দিতে গেলে, অনুগ্রহ করে আমাদের লেখা-জমা-দিন মেনু-তে ক্লিক করুন ও নিজেকে Author হিসেবে Register করুন এবং আমাদের পরবর্তী আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ অনুসরণ করুন।
অন্যান্য
শ্রাবণ সন্ধ্যা
শাস্তি
তিতির কান্না